রবিবার, ১০ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২৭শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - গ্রীষ্মকাল || ২২শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

কাপাসিয়ায় এক পরিবারের পাঁচ খুন: মানবিক দায়িত্বে এগিয়ে এলো জেলা প্রশাসন

কাপাসিয়ায় এক পরিবারের পাঁচ খুন: মানবিক দায়িত্বে এগিয়ে এলো জেলা প্রশাসন
বার্তাবিডি ডেস্ক
প্রকাশের সময় :

কাপাসিয়ার রাউতকোনা গ্রামের সেই রাতটা যেন এখনো ভারী হয়ে আছে মানুষের বুকের ভেতর। নিস্তব্ধ গ্রামের বাতাস ভেদ করে ছড়িয়ে পড়েছিল এক হৃদয়বিদারক খবর- একই পরিবারের পাঁচজনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। ছোট্ট ঘরের মেঝেতে পাশাপাশি পড়ে ছিল তিন শিশুর নিথর দেহ। বিছানার ওপর ছিল তরুণ রসুলের লাশ। আর জানালার গ্রিলের সঙ্গে হাত-মুখ বাঁধা অবস্থায় পড়ে ছিলেন শারমিন খানম। চারদিকে রক্ত, ক্ষত-বিক্ষত শরীর আর অসহনীয় শোক।

খবরটি পৌঁছে যায় জেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বিষয়টিকে শুধু একটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখেননি; তিনি দেখেছেন একটি ভেঙে যাওয়া পরিবারের শেষ যাত্রার মানবিক দায়িত্বও। তাঁর নির্দেশে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সালমা খাতুন, কাপাসিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তামান্না তাসনীম, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নাহিদুল হক এবং জেলা প্রশাসনের দুইজন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট।

সেখানে গিয়ে তারা শুধু হত্যার নির্মমতা দেখেননি, দেখেছেন স্বজন হারানো মানুষের অসহায় কান্নাও। নিহতদের বাড়ি গোপালগঞ্জে হওয়ায় দ্রুত ময়নাতদন্ত শেষ করে মরদেহ পাঠানো জরুরি হয়ে পড়ে। কিন্তু সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী দুপুর দুইটার পর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত কার্যক্রম বন্ধ থাকে। তবু পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে জেলা প্রশাসক নিজেই সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কারণ, মরদেহগুলোর শরীরজুড়ে ছিল গভীর ক্ষত। বিলম্ব হলে দ্রুত পচন ধরার আশঙ্কা ছিল।

শেষ পর্যন্ত সেদিনই পাঁচজনের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এখানেই থেমে থাকেননি জেলা প্রশাসক। পরে জানতে পারেন, মরদেহগুলো সাধারণ পিকআপে করে গোপালগঞ্জ নেওয়া হবে। আকাশে তখন বৃষ্টির আশঙ্কা। ভেজা পথে দীর্ঘ যাত্রায় মরদেহ নষ্ট হয়ে যেতে পারে—এই চিন্তা থেকেই তিনি ব্যবস্থা করেন দুটি ফ্রোজেন গাড়ির। যেন শেষ বিদায়টুকু অন্তত সম্মানের সঙ্গে সম্পন্ন হয়।

এদিকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত শারমিনের বাবা শাহাদাত মোল্লা বাদী হয়ে কাপাসিয়া থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় শারমিনের স্বামী ফোরকান মোল্লাকে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর থেকেই তিনি পলাতক। কাপাসিয়া থানার ওসি শাহীনুর আলম জানান, ফোরকানকে গ্রেফতারে একাধিক টিম কাজ করছে।

স্থানীয়রা বলছেন, প্রায় ১৬ বছর আগে শারমিনের সঙ্গে ফোরকানের বিয়ে হয়েছিল। সংসারের টানে তারা ঢাকায় থাকতেন। কয়েক মাস আগে কাপাসিয়ায় এসে নতুন করে বসবাস শুরু করেন। কেউ কল্পনাও করেনি, সেই ঘর একদিন এমন বিভীষিকার সাক্ষী হবে।

রাউতকোনার মানুষ এখনো আতঙ্কে। শিশুদের হাসির শব্দে ভরা যে বাড়িটি একসময় জীবন্ত ছিল, আজ সেখানে শুধু নীরবতা আর কান্নার প্রতিধ্বনি।