, || - ||

‘ক্লিক বেইট’ বা বিভ্রান্তিকর শিরোনাম নয়: ডিসি গাজীপুর

‘ক্লিক বেইট’ বা বিভ্রান্তিকর শিরোনাম নয়: ডিসি গাজীপুর
বার্তাবিডি ডেস্ক
প্রকাশের সময় :

সকালের চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে খবরের কাগজে চোখ বোলানো কিংবা ড্রয়িংরুমে সোফায় হেলান দিয়ে টেলিভিশনের পর্দায় নজর রাখা- খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, এটিই ছিল বাঙালির প্রাত্যহিক অভ্যাসের চিরায়ত রূপ। কিন্তু সময়ের চাকা ঘুরেছে দ্রুত। প্রযুক্তির তীব্র আলোয় আজ সেই অভ্যাসে লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। এখন ভোরবেলা চোখ মেলা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত মানুষের নিত্যসঙ্গী হাতের স্মার্টফোনটি। ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা টিকটকের স্ক্রল করার চাকার সাথে ঘুরছে মানুষের মনন ও মস্তিষ্ক। অজান্তেই এই ছোট ছোট ভিডিও বা কনটেন্টগুলো মানুষের চিন্তাচেতনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।

ডিজিটাল যুগের এই নতুন বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং এই বিপুল শক্তিকে কীভাবে ইতিবাচক ও সামাজিক কল্যাণে রূপান্তর করা যায়, তা নিয়েই গাজীপুরে জেলা প্রশাসন এক ব্যতিক্রমী ও দূরদর্শী উদ্যোগ নিয়েছে। জেলার তরুণ ও উদীয়মান কনটেন্ট নির্মাতাদের (Content Creators) নিয়ে আয়োজন করা হয়েছিল এক প্রাণবন্ত মতবিনিময় সভা। উদ্দেশ্য একটাই- সামাজিক দায়বদ্ধতা রক্ষা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গুজবের ভিড়ে সত্যকে তুলে ধরা।

গাজীপুর জেলা প্রশাসনের এই আয়োজনে মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কনটেন্ট নির্মাতাদের সামাজিক দায়িত্ব। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বড় ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ক্লিক বেইট’ বা বিভ্রান্তিকর শিরোনাম। ভেতরের খবরের সাথে শিরোনামের কোনো মিল না রেখে ভিউ বাড়ানোর যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, তা রুখে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয় এই সভা থেকে। পাশাপাশি কোনো তথ্য না জেনে শেয়ার বা কনটেন্ট তৈরি না করে ‘ফ্যাক্ট চেকিং’ বা তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাসের ওপর জোর দেওয়া হয়। যেকোনো প্রাকৃতিক বা সামাজিক দুর্যোগকালীন সময়ে একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর কীভাবে বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন, সেই দিকনির্দেশনাও উঠে আসে আলোচনায়।

মতবিনিময় সভায় গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো: নূরুল করিম ভূঁইয়া কনটেন্ট নির্মাতাদের উদ্দেশ্যে এক অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, “মানুষ তার কর্মের মাধ্যমেই সমাজে পরিচিতি লাভ করে।”

তিনি সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সবসময় সঠিক তথ্য উপস্থাপনের পাশাপাশি কনটেন্টের ‘ফর্মিং অ্যান্ড ফ্রেমিং’ (Forming & Framing) বা উপস্থাপনার কৌশলের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। শুধু বিনোদনই নয়, কনটেন্ট ক্রিয়েশনকে কীভাবে মূলধারার একটি লাভজনক ও সম্মানজনক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, সেই স্বপ্নও দেখান তিনি।

বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি বিশ্বখ্যাত কৌতুক অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন এবং বাংলাদেশের বিনোদন জগতের জীবন্ত কিংবদন্তি, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র পরিকল্পনাকর্তা ও উপস্থাপক হানিফ সংকেতের উদাহরণ টেনে আনেন। তিনি দেখিয়ে দেন, কীভাবে নিছক কৌতুক বা বিনোদনের আড়ালে সমাজে অত্যন্ত শক্তিশালী ও গভীর ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন মেধা এবং ভিডিও ও অডিওর সঠিক সামঞ্জস্য। কেবল কথার কথা নয়, গাজীপুরের এই তরুণ নির্মাতাদের দক্ষতাকে আরও শাণিত করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি দিনব্যাপী বিশেষ কর্মশালা (Workshop) আয়োজনের দারুণ এক সুখবরও দেন জেলা প্রশাসক।

ডিজিটাল দুনিয়ার এই নতুন কারিগরদের উৎসাহিত করতে সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব ও এলএ) জনাব মো: সোহেল রানা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জনাব মো: শাহরিয়ার নজির এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) জনাব এম. রকিবুল হাসানসহ জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিবৃন্দ।

প্রযুক্তির এই জোয়ারে গা ভাসিয়ে না দিয়ে, বরং তাকে শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করে একটি সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের যে বার্তা গাজীপুর জেলা প্রশাসন দিল, তা সত্যি প্রশংসনীয়। এখন দেখার অপেক্ষা, গাজীপুরের কনটেন্ট নির্মাতারা তাদের ক্যামেরার লেন্সে কীভাবে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের গল্পগুলো বুনে চলেন।