শুক্রবার, ২২শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - গ্রীষ্মকাল || ৪ঠা জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে জেলা প্রশাসন

সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে জেলা প্রশাসন
বার্তাবিডি ডেস্ক
প্রকাশের সময় :

একটি সড়ক দুর্ঘটনা- আর মুহূর্তেই ওলটপালট হয়ে যায় একটি সাজানো সংসার। কোনো কোনো চাকা শুধু পিচঢালা পথেই ঘোরে না, পিষে দেয় একটি পরিবারের স্বপ্ন, থামিয়ে দেয় স্বাভাবিক জীবনের সংগ্রাম। কেউ হারান পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে, কেউবা পঙ্গুত্ব বরণ করে জীবন্ত লাশের মতো বেঁচে থাকেন।

গাজীপুর জেলার এমন ২৭টি অসহায় ও ভাগ্যবিড়ম্বিত পরিবারের জীবনে বৃহস্পতিবার (২১ মে) আশার আলো হয়ে এলো সরকারের মানবিক সহায়তা। আসন্ন ঈদের আগে গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ‘ভাওয়াল সম্মেলন কক্ষে’ আয়োজিত এক আবেগঘন অনুষ্ঠানে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের স্বজনদের মাঝে বিআরটিএ (BRTA) ট্রাস্টি বোর্ডের তহবিল থেকে মোট ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার আর্থিক সহায়তার চেক বিতরণ করা হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের হাতে অনুদানের চেক তুলে দেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া।

অনুষ্ঠানকক্ষের এক কোণে ক্রাচে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন ৩৫ বছর বয়সী সাবেক পিকআপ চালক মো. সেলিম। গত বছর এক সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন একটি পা। যিনি এতদিন নিজে গাড়ির চাকা ঘুরিয়ে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করতেন, দুর্ঘটনার পর থেমে যায় তার নিজের জীবনের চাকাই।

চার সদস্যের পরিবার নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাওয়া সেলিম সহায়তার চেক হাতে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন,

“দুর্ঘটনা আমার পা কেড়ে নিয়ে পরিবারটাকে এক লহমায় রাস্তায় বসিয়ে দিয়েছিল। ধারদেনা আর মানুষের করুণায় দিন কাটছিল। আজ এই সহায়তা পেয়ে মনে হচ্ছে আবার সন্তানদের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দিতে পারবো। আমি আবার বাঁচতে চাই।”

সেলিমের পাশেই নিথর চোখে বসে ছিলেন খাদিজা আক্তার। গত বছর এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি হারিয়েছেন তার ২৫ বছর বয়সী সন্তানকে—যে ছিল পরিবারের একমাত্র ভরসা।

চেকটি বুকে জড়িয়ে ধরে অশ্রুসজল চোখে তিনি বলেন,

“যে চলে গেছে তাকে তো আর কোনোদিন ফিরে পাবো না। সন্তানের শূন্যতা কি টাকা দিয়ে পূরণ হয়? তবে এই কঠিন সময়ে সরকার যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে, তাতে অন্তত পরিবারটাকে নিয়ে বেঁচে থাকার একটা অবলম্বন পেলাম।”

চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, “আর্থিক সহায়তা কখনো জীবনের ক্ষতি বা পঙ্গুত্বের বেদনা মুছে দিতে পারে না। তবে এটি সংকটের মুহূর্তে পরিবারগুলোকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি যোগাবে।”

তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর উদ্দেশ্যে বলেন, “এই টাকাটি কোনো অনুৎপাদনশীল কাজে ব্যয় না করে এমন কাজে ব্যবহার করুন, যেখান থেকে স্থায়ী আয়ের পথ তৈরি হয়।”

এ সময় তিনি সড়ক দুর্ঘটনা রোধে চালক, শ্রমিক ও পথচারীদের ট্রাফিক আইন মেনে চলা এবং রাস্তায় গতি নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানান। জেলা প্রশাসক বলেন,

“একটি দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষের জীবন নেয় না, পুরো পরিবারকে জীবন্ত কবর দেয়।”

অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সালমা খাতুন, বিআরটিএ’র কর্মকর্তাবৃন্দ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

সরকারের এই মানবিক উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন গাজীপুরের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, এই সহায়তা শুধু আর্থিক অনুদান নয়; বরং এটি বিপন্ন মানুষের পাশে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল উপস্থিতির এক মানবিক দৃষ্টান্ত।