প্রকাশের সময় :
বাংলার চিরচেনা লোকজ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো বাঁশ। এক সময় কুটির শিল্পের প্রধান কাঁচামাল হিসেবে বাঁশের ব্যাপক ব্যবহার থাকলেও মাঝে কিছুটা ভাটা পড়েছিল। তবে বর্তমানে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ায় আবারও আলোচনায় এসেছে বাঁশ শিল্প। সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই শিল্প হতে পারে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত।
এক সময় বাঁশ দিয়ে কেবল কুলা, ঝুড়ি, খাঁচা বা মাদুর তৈরি হতো। কিন্তু এখন আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বাঁশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন আসবাবপত্র, ফ্লোর টাইলস, শোপিস, ল্যাম্পশেড, এমনকি পোশাক তৈরির সুতাও। টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব হওয়ায় আধুনিক অন্দরসজ্জায় বাঁশের পণ্যের কদর এখন আকাশচুম্বী। বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে ‘গ্রিন প্রোডাক্ট’ হিসেবে বাঁশের তৈরি পণ্যের বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে।
বাঁশ শিল্প মূলত শ্রমনির্ভর। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাজার হাজার পরিবার বংশপরম্পরায় এই শিল্পের সাথে জড়িত। শিল্পনগরী গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বাঁশ দিয়ে বৈচিত্র্যময় পণ্য তৈরি করছেন। এই খাতের উন্নয়ন করা সম্ভব হলে গ্রামের নারীদের বিশাল একটি অংশ ঘরে বসেই আয়ের সুযোগ পাবে, যা গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে বাঁশকে বলা হয় ‘সবুজ সোনা’। এটি অন্যান্য গাছের তুলনায় ৩৫% বেশি অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং দ্রুত কার্বন শোষণ করতে পারে। প্লাস্টিক দূষণ রোধে বাঁশের তৈরি ডিসপোজেবল কাটলারি (চামচ, স্ট্র, প্লেট) এখন বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হচ্ছে। বাংলাদেশ যদি প্লাস্টিকের বদলে বাঁশের পণ্যের স্থানীয় বাজার বড় করতে পারে, তবে তা পরিবেশ রক্ষায় বড় মাইলফলক হবে।
বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কিছু সমস্যার কারণে এই শিল্প কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে না। এর মধ্যে প্রধান হলো উন্নত প্রযুক্তির অভাব, সনাতন পদ্ধতিতে কাজ করা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের সংকট। বিসিক (BSCIC) এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো যদি এই খাতের উদ্যোক্তাদের উন্নত প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মেলার সুযোগ করে দেয়, তবে বাঁশ শিল্প হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম শক্তিশালী খাত।
বাঁশ কেবল একটি উদ্ভিদ নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ এবং টেকসই উন্নয়নের হাতিয়ার। আধুনিকায়ন আর সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা যদি এই শিল্পের বিকাশ ঘটাতে পারি, তবে একদিকে যেমন গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, অন্যদিকে বৈশ্বিক বাজারে পরিবেশবান্ধব ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত হবে বাংলাদেশ।